আনোয়ারা উপজেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের করিডোরে বসে মায়ের কথা বলছিল বিজয় দত্ত। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাইরে করিডোরের এক কোণে বসে ‘মা... মা...’ বলে চিৎকার করে কাঁদছিল ১৫ বছরের কিশোর বিজয় দত্ত। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল হাসপাতালের চারপাশ।
উপস্থিত লোকজনের চোখও তখন ভিজে উঠছিল নোনা জলে। একটু পরপরই বিলাপ করে বিজয় বলছিল, ‘এমন তো কখনো হয়নি, মা তো প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতো। আজ কেন আসছে না? আমার মা কই?’
বিজয় দত্ত বলে, ‘মা সকালে আমাদের জন্য দিনের সব খাবার রান্না করে দিয়ে অফিসে যেত। সারাদিনের পরিশ্রমের পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেই আবার শুরু হতো সংসারের কাজ। ৭-৮ বছর ধরে আমাদের জন্য এই হাড়ভাঙা খাটুনি করে যাচ্ছেন। মা তো কিছু সময়ের জন্য আমাদের ছেড়ে বাইরে থাকে। একেবারে তো কখনো চলে যায়নি। আজ কেন ফিরল না? আমাদের কেন এখানে আসতে হলো!’
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাত আনুমানিক আটটার দিকে চট্টগ্রামের আনোয়ারার কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক মোড়ে যাত্রীবাহী বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষ কেড়ে নিয়েছে বিজয়ের মা কলি দত্তের (৩৫) প্রাণ। নিহত কলি দত্ত পেশায় একজন পোশাকশ্রমিক হিসেবে কোরিয়ান ইপিজেড (ইয়াংওয়ান)-এ কর্মরত ছিলেন। প্রতিদিনের মতো কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথেই এই নির্মম দুর্ঘটনা তার জীবনের প্রদীপ নিভিয়ে দেয়। এই দুর্ঘটনায় কলি দত্ত ছাড়াও আরও এক নারী নিহত হয়েছেন।
বিজয় দত্ত আনোয়ারা বারখাইন ঝি.বা.শি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। দুই ভাইয়ের মধ্যে সে ছোট। তার বড় ভাই সৈকত দত্ত (১৯) কলেজে ভর্তি হলেও বর্তমানে নানা প্রতিকূলতায় পড়াশোনা থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছে। বাবা কাজল দত্ত পেশায় একজন প্রান্তিক কৃষক। নুন আনতে পান্তা ফুরানো এই সংসারে হাল ধরতে এবং দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কাজল দত্তের পাশাপাশি কলি দত্তও পোশাক কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করতেন। মায়ের এই আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবারটি এখন দিশেহারা।
হাসপাতালের সামনে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসেছিলেন কলি দত্তের বৃদ্ধ বাবা। ছলছল চোখে তিনি বলেন, ‘কলি আমার ছোট মেয়ে। অনেক কষ্ট করে সংসারটা আগলে আগলে রাখছিল। কীভাবে কী ঘটল, আমি এখনো মাথায় নিতে পারছি না। শুধু শুনেছি আমার মেয়ে আর নাই। আমার ছোট মেয়েটা এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, তা ভাবতেও পারছি না।’
বোনের এমন মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না বড় বোন জলি দত্ত। বিলাপ করতে করতে তিনি বলেন, ‘আমার বোনটা সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটত শুধু ওর সন্তানদের একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ দেওয়ার জন্য। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে কাজ শেষে ঠিক সময়ে বাড়ি ফিরে আসতো। গতকালও তো আসার কথা ছিল। কিন্তু একটা বেপরোয়া বাস আমার বোনের সব স্বপ্ন শেষ করে দিল। আমরা এখন এই অনাথ ছেলেগুলোকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াব?’
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে আনোয়ারা টানেল সংযোগ চত্বরে কোরিয়ান ইপিজেডের শ্রমিকবাহী একটি দ্রুতগতির আহাদ পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারায়। বেপরোয়া গতির বাসটি চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্তত ছয়টি সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে সজোরে চাপা দিলে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই দুই নারী নিহত হন। নিহতরা হলেন– আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের ঝিওরি গ্রামের বাসিন্দা কলি দত্ত(৩৫) ও ইফা শীল(৪০) এবং আহত হন আরও ২১ জন। দুর্ঘটনার পর পথচারী ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।
আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মজনু মিয়া বলেন, ‘ঘাতক বাসটিকে আমরা আটক করেছি, তবে চালক ও সহকারী পালিয়ে গেছে। নিহতদের মরদেহ স্বজনদের অনুরোধে বিনা ময়নাতদন্তে হস্তান্তর করা হয়। এখন পর্যন্ত মামলা দায়ের হয়নি। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা নেবে।’
জানতে চাইলে কোরিয়ান ইপিজেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। কেইপিজেড-এ কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের গ্রুপ ইন্সুরেন্স বা বিমা পলিসি রয়েছে। এ ছাড়া কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কারণে ওই শ্রমিকের পরিবার নিয়মানুযায়ী সার্ভিস ইন্সুরেন্সের সুবিধাও পাবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নিহত শ্রমিক ঠিক কোন কারখানায় কর্মরত ছিলেন, তা আমরা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। কারখানা শনাক্ত হওয়া মাত্রই তার পরিবারের কাছে দ্রুততম সময়ে সব ধরনের আইনি আর্থিক সুবিধা ও সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।’
মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠছে টানেল মোড়? স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, টানেল সংযোগ সড়কটি চালুর পর থেকে এই টানেল চত্বর মোড়টি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বিকেল ও সন্ধ্যার পর পোশাক কারখানার ছুটির সময়ে এখানে হাজারো শ্রমিকের যাতায়াত থাকে। এই ব্যস্ত সময়েও অনেক দূরপাল্লার এবং লোকাল বাস গতির প্রতিযোগিতা করে চত্বর পার হওয়ার চেষ্টা করে। এছাড়া চাতরী চৌমুহনী বাজার থেকে উল্টোপথে আসা বাস ও ট্রাকগুলো চত্বর না ঘুরেই টানেল সড়কে প্রবেশ করে। এতে এর আগে বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে এক মাইক্রোবাস চালক। নির্দিষ্ট গতিসীমা না মানা এবং পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ কিংবা গতি নিয়ন্ত্রক না থাকায় এখানে প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহেদ বলেন, ‘টানেল মোড়ে সন্ধ্যার পর পার হওয়া মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। গাড়িগুলো যেভাবে আসে, মনে হয় যেন রেসিং ট্র্যাক। প্রশাসন যদি এখনই এখানে কঠোর গতি নিয়ন্ত্রণ না করে, তবে আরও অনেক জীবন অকালে ঝরে যাবে।’
মায়ের ফেরার পথ চেয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় যে ছেলেটি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতো, সেই বিজয়ের অপেক্ষা আর কখনো শেষ হবে না। একটি বেপরোয়া গতি চিরترে স্তব্ধ করে দিল একটি সাধারণ পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনকে।