যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরি করার স্বপ্ন দেখা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিবাসন পরিকল্পনা। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং (ওপিটি) কর্মসূচিতে অংশ নিতে এক লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় এক কোটি টাকার বেশি) ফি আরোপের কথা বিবেচনা করছে মার্কিন সরকার।
বর্তমানে ওপিটি কর্মসূচির আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জনের পর কোনো আলাদা কর্মভিসা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ এক বছর কাজ করতে পারেন। এছাড়া বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) বিষয়ের শিক্ষার্থীরা অতিরিক্ত আরও দুই বছর অর্থাৎ মোট তিন বছর পর্যন্ত কাজের সুযোগ পান।
যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটিই ভারতের। ওপেন ডোরস প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ লাখ ৬৩ হাজারের বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন, যা বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, ওপিটির ওপর ফি আরোপের এই প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতিরই অংশ। এর আগে নতুন এইচ-১বি ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রেও ১ লাখ ডলার ফি আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তির মুখে আদালতের আদেশে স্থগিত করা হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি এবং পরবর্তীতে এইচ-১বি ভিসায় রূপান্তরের প্রচলিত পথটি ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়বে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওপিটি কর্মসূচিই মূলত মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরি পাওয়ার এবং পরবর্তী সময়ে এইচ-১বি ভিসার প্রধান সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। নতুন এই প্রস্তাব কার্যকর হলে কেবল এই সুযোগ পাওয়ার জন্যই শিক্ষার্থীদের ১ লাখ ডলার ফি দিতে হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দাবি, ওপিটি কর্মসূচির অপব্যবহার রোধ এবং ভিসা জালিয়াতি ঠেকাতে এই পদক্ষেপ জরুরি। তবে সমালোচকদের মতে, এত বড় অঙ্কের ফি প্রকৃত মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীদেরই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত প্রায় ৪০ শতাংশ ভারতীয় শিক্ষার্থী ওপিটি কর্মসূচির সুবিধা নেন। যেহেতু অনেক শিক্ষার্থী ব্যাংক ঋণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যান এবং স্নাতক শেষে চাকরি করে সেই ঋণ শোধের পরিকল্পনা করেন, তাই নতুন এই ফি চালু হলে তাদের পুরো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। শিক্ষা পরামর্শকদের মতে, এই নীতি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থীরা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি বা অস্ট্রেলিয়ার মতো বিকল্প দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ভিসা সাক্ষাৎকারে দীর্ঘসূত্রতা ও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের কারণে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্টের মধ্যে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের নতুন ভর্তি প্রায় ৪৫ শতাংশ কমেছে। জরিপে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ৯৬ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ও ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতাকেই শিক্ষার্থী হ্রাসের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সব মিলিয়ে, দক্ষ বিদেশি কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে।

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!